বুধবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৮

হুইল চেয়ার

হুইল চেয়ারটা না কিনলে কী হতো, মা আর
দিনই বা বাঁচবে...!’
মুখ বাঁকিয়ে বকবকাচ্ছে মিলি। স্বামীটার নেই
একটুও বিবেচনাবোধ, টাকাগুলো জলে ভাসালো
স্ত্রীর চিৎকার শুনে শুনে যন্ত্রণাদগ্ধ মিলন
ধরালো সিগারেট। ধুয়ায় ঘরটা ধুয়াটে। ইচ্ছে হচ্ছিল
সারা বাড়ি আগুনে ¦ালিয়ে দিতে।

পাশের ঘরেই বৃদ্ধা, শুয়ে শুয়ে শুনছেন। চোখের কোণের
জল গড়িয়ে পড়লো বালিশে।
বউ-ছেলেতে ঝগড়া, কারণ
হুইল চেয়ারটা। মনে মনে বললেনÑ
আজরাইল কেন আসে না...! পরগাছা হয়ে
বাঁচার চেয়ে মৃত্যু ভালো।

চার বছরের শিশু চেঁচামেচি শুনে খেলনাগুলো গুটিয়ে
ভয়ে কাঁপে। মায়ের দিকে তাকায়, তাকায় বাবার মুখে
কাজের মেয়েটা বলেÑ ‘মানুষকে তার কর্মফল
পৃথিবীতেই পেতে হয় গো খালা, আপনার পুত্রবধু
করবে এমন আচরণ যেমনটা করছেন শাশুড়ির সাথে।
মিলি বিদ্রুপের সুরে শুনায়Ñ ‘পুটলা-পুটলি বেঁধে
দেবো বাপের বাড়ি পাঠিয়ে। বুঝবে তখন।

বৃদ্ধাকে বেশিদিন সইতে হয়নি, মৃত্যু এসে নিয়ে গেছে।
হুইল চেয়ারটা কিছুকাল বারান্দার কোণায়
যতেœ ছিল তোলা। দেখলাম, তাদের একমাত্র ছেলেকে
কাজের মেয়েটা সেই চেয়ারে চড়িয়ে
বারান্দা ঘরে আনা-নেওয়া করে।
কী এক অজ্ঞাত রোগে ছেলেটা এখন পঙ্গু। ডাক্তার জানিয়েছেন
কোনদিন পারবে না নিজ পায়ে দাঁড়াতে।
ওদের বারান্দার গ্রিলে চোখ রেখে বলিÑ ‘চাকাওয়ালা চেয়ার
কেনার টাকাগুলো বৃথা গেলেই ভালো হতো।

উৎসব




বাবা যাদের সরকারি অফিসে ছা-পোষা কেরান
তাদের আবার উৎসব কী! তিন বেলা খেতে পাই, এই তো বেশি।
আমরা হিন্দু। অফিসের বড়কর্তা
বাবাকে দিয়েছিলেন নিমন্ত্রণ- ‘বেড়াতে এসো সপরিবারে,
ঈদে খুব আনন্দ হয়।

প্রভাতে দেখলাম মুসলিম লোকদের পরনে
পাঞ্জাবি-টুপি, হাতে জায়নামাজ, দল বেঁধে
যাচ্ছে ঈদগাহে। নামাজ শেষে পশুর গলায় চালাবে ছুরি।
বেলা বাড়তেই বাবা ডেকে বললেনÑ ‘চল বেড়িয়ে আসি
স্যারের বাসায়। সম্মানিত লোক, সাক্ষাৎমাত্র
পা ছুঁয়ে করবি সালাম।
বাবার কথা রাখলাম। স্যার আমাকে
অবাক করে হাতে ধরিয়ে দিলেন
দুটি পাঁচশো টাকার নোট, ঈদের সালামী।
এবং পরম মমতায় বসালেন পাশের সোফায়; খেতে দিলেন
দুধেল সেমাই, ভাজা মিষ্টি পাঁপড়। বাবার সঙ্গে স্যার
কথা বলছিলেন এমন হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিমায়, দেখলে কে বুঝবে
অফিসের বড়কর্তা আর সামান্য কেরানীতে চলছে আলাপ!

স্যারের একটা ছেলে, আমারই মতন বয়স। দুজনে
অনেকটা সময় খেললাম ক্রিকেট, দেখলাম
কুরবানীর মাংসের কাটাকুটি।
যখন বিদায় নিয়ে চলে আসবো, আমাকে দিলো
খাসির মাংসভরা একটা থলি। প্রায় দুকেজি ওজন।
চোখ জলে ঝাপসা হয়ে এলো, আর নম্রতায়
নতমাথায় ভাবলাম- ‘ধর্ম যাই হোক, কোন উৎসবই
কারও একার নয়, আর ঈদও একটা উৎসব।

বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৭

একরাত অভিমান


কমলারঙের শাড়ি ছিলো পরনে, আঁচলটা কাধ বেয়ে
কোমড়ের কাছে এনে বাঁধা। কেমন একটা জাদরেল ভাব মুখটায় আঁকা
চলার গতিতে স্পষ্ট তাড়াহুড়ো, নির্বাক অধর। কোথাও যাবার
আয়োজনে ব্যস্ত নিশিতা।
পুটলা পুটলী তৈরি, বড়সড় স্যুটকেস শুধু তার নিজস্ব
কাপড় চোপড়, কসমেটিকÑকয়েকটা নৈমিত্তিক টুকিটাকিতে পূর্ণ।

তার স্বামী নুহাশ, দরজার পাশটায় টেবিল যে ছিল এক ঘুণ ধরা
তার উপর বসে। চোখ জলে ছলছল, মুখে হাসি টানা
বউ এর প্রস্তুতি দেখে- আড়চোখে নিরীক্ষণ। যেন এই চলে যাওয়াতে
তার নেই কোন ভ্রোক্ষেপ। স্বামী-স্ত্রীতে সামান্য বিবাদ, কথা কাটাকাটি
তাই এই বিদায়ের আয়োজন এসেছে ঘনিয়ে।

তিন বছরের সংসার, ছেলেমেয়ে নেই-
পিছুটান মুক্ত। এতোবড়ো সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটুও লাগেনি সময়।
নিশিতা বাপের বাড়িতে নেবে ঠাঁই, স্বামী যাক জাহান্নামে।

বাইরে বিকেল, মেঘগুলো সোনালি আবির মাখা। আকাশের চিলগুলো
একটাও নেই আকাশে।
বেরিয়ে যাবে নিশিতা, নুহাশের মৌনতা- ইজি চেয়ারে বসে
গালে হাত ঠেসা, জানালার ফাঁক দিয়ে উদাসীন দৃষ্টি দিগন্তের খোলামাঠে।

ছিলো একগোছা চাবি
নিশিতার আচলে বাধা। চাবি গোছা রাখতে গিয়ে ওয়ারড্রবের ছাদে
চোখে তার পড়লো একটা ছবি কাঁচ দিয়ে মোড়ানো
বিয়ের প্রথম বছর সেই যে গিয়েছিলো হানিমুনে, সেখানেই তোলা।
নুহাশ আর নিশিতা
একত্রে ঠেস দিয়ে বসা গাছের শেকড়ে, হাতে হাত ধরা।
মনে তার পড়লো কিছু স্মৃতি ভাসা ভাসা- বিদায়ের বেলা
ছবিটার পাশে দাঁড়িয়েই।

নুহাশের চাইছিল মন বলবে নিশিতাকেÑ‘অন্তত
আজ রাতটা থেকে যাও’ -তবু বলা হলো না।
চরম অভিমান, বউ এর কাছে যাবে হেরে
এমনটা হয় কেমনে...!
যাবার বেলায় নিশিতার মনে বারবার খেলা করে
একটা বিষয়। একবার, শুধু একবার বলতো যদি নুহাশ
‘যেয়ো না গো’- রাগে কিংবা অভিমানে, তবু যাত্রা এখানেই হতো ভঙ্গ।
দেখলো নিশিতা পিছু ফিরে ফিরে- নাবোধক ইশারা... তাও পেল না বেচারী
স্বামীর কাছ থেকে, তাই চলে গেল ভারী স্যুটকেস পিছু পিছু টেনে।

সন্ধ্যার খানিক বাদে গেলো সে পৌঁছে
বাবা মার বাসায়। নিশিতার অনাকাক্সিক্ষত আগমনে
পিতা মাতা শঙ্কিত- ‘কিরে...
নুহাশকে দেখছি না যে, রাগ করে এলি বুঝি?’ নিশিতা দিলো না
জবার কোন- শুধু রইলো মুখ গোমরা করে।

রাতে খাবার টেবিলে বারবার
গিরো গেলো এটে নিশিতার গলায়, খাওয়া হলো না। মনে পড়ে
নুহাশের স্মৃতি- কেন এই অভিমান।
এদিকে নুহাশ কেমনে করবে আহার নিশিতাকে ফেলে- এ কথা ভেবে
ছাদে করলো বিচরণ একাকি অন্ধকারে, খিদে গেল মিটে হাওয়া চিবিয়ে।

বিছানায় শুয়ে ঘুম এলো না চোখের পাতায়- পাশের বালিশ
খালি পড়ে আছে, স্ত্রী নেই ঘরে।
কী একটা বেদনা যেন কুঁকড়ে ধরলো নুহাশকে সহসা
ডিমলাইটের সবুজাভ অল্প আলোতে। সদ্য জবাই করা মোরগের মতো
ছটফট করে বারবার রাখলো হাত
খালি বিছানায়- নিশিতা যেখানে ঘুমায় নিরবে।
এদিকে নিশিতা ঘুমায়নি কোন রাত স্বামীকে জড়িয়ে না ধরে বুকে-
পতির সোহাগ তার ঘুমের মহা ঔষধ। এপাশ ওপাশ
করলো সে বই এর পাতা যেমন
উলটে বাতাসে, আঘাত প্রাপ্ত কেচুর মতো শ্বাসরুদ্ধ অস্তির।

মধ্যরাতে নুহাশ বসে টেলিফোন স্যাটটার সামনে
কয়েকটা চাপ বাটনে- নিশিতাদের বাসার নাম্বার। রিং দিতে গিয়ে
রেখেদিলো টেলিফোন কি জানি কি ভেবে। বউ এর কাছে যাবে হেরে
এমনটা হয় কেমনে...!
‘একটা কল ও তো দিলো না নুহাশ’- ভাবে নিশিতা
ক্ষণে ক্ষণে ল্যাম্পলাইট জ্বালিয়ে নিভিয়ে। মোবাইল মনিটরে নাম্বার টুকে
কল তবু দিলো না- এতো রাতে নুহাসকে ডিস্টার্ব
হবে না উচিৎ। দুজনার রাত গেল কেটে অসহ্য অনিদ্রায়।

খুব প্রভাতে সেজেগুজে
প্রস্তুত নিশিতা। মা বললো ডেকে- ‘নাস্তাটা খেয়ে যা, রাতে ভালো খাসনি।’
কে শুনে কার কথা, যেন নুহাশকেই বেশি প্রয়োজন
নাস্তার চেয়ে। এমন সময় কলিং বেলটা সুর করে
উঠলো বেজে, দরজা খুলতেই মাথানত নুহাশ ঢুকলো ঘরে।
‘এ কি বাবা তুমি, এতো প্রভাতে...!’ -বিস্মিত শ্বশুর মশাই, বিড়বিড় করে
বললো নুহাশ- ‘বউ এর কাছে হেরে যাওয়া, এ তো আর পরাজয় নয়।’